মাধ্যমিক ইতিহাস দ্বিতীয় অধ্যায় সংস্কারের সম্পূর্ণ নোট — রামমোহন রায়, বিদ্যাসাগর, ব্রাহ্মসমাজ, সতীদাহ রদ, বিধবাবিবাহ আইন সব কিছু বিস্তারিত। MCQ SAQ ও রচনাধর্মী প্রশ্ন উত্তর। WBBSE 2027।
- ভূমিকা
- এই অধ্যায় থেকে পরীক্ষায় কত নম্বর আসে?
- প্রথম অংশ — ঊনবিংশ শতকের বাংলা ও পত্রপত্রিকায় সমাজচিত্র
- দ্বিতীয় অংশ — শিক্ষা সংস্কার
- তৃতীয় অংশ — সমাজ সংস্কার
- চতুর্থ অংশ — ধর্মীয় সংস্কার
- পঞ্চম অংশ — বাংলার নবজাগরণ সম্পর্কে বিতর্ক
- MCQ প্রশ্নোত্তর — ইতিহাস অধ্যায় ২
- SAQ প্রশ্নোত্তর
- রচনাধর্মী প্রশ্ন
- গুরুত্বপূর্ণ তারিখ — পরীক্ষায় সাল মনে রাখা জরুরি
- সচরাচর জিজ্ঞাসা (FAQ)
ভূমিকা
মাধ্যমিক ইতিহাসের দ্বিতীয় অধ্যায় “সংস্কার: বৈশিষ্ট্য ও পর্যালোচনা” ঊনবিংশ শতকের বাংলার সামাজিক, ধর্মীয় ও শিক্ষামূলক সংস্কার আন্দোলন নিয়ে। এই অধ্যায় থেকে প্রতি বছর মাধ্যমিক পরীক্ষায় উল্লেখযোগ্য সংখ্যক প্রশ্ন আসে।
ঊনবিংশ শতকে বাংলায় পাশ্চাত্য শিক্ষার আলোয় একদল মানুষ সমাজের অন্ধকার দিকগুলো দূর করার জন্য এগিয়ে আসেন। রামমোহন রায়, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, হেনরি ডিরোজিও, স্বামী বিবেকানন্দ প্রমুখ মহান ব্যক্তিরা এই সংস্কার আন্দোলনের নেতৃত্ব দেন।
এই পোস্টে সমস্ত সংস্কারকর্মীদের কাজ, গুরুত্বপূর্ণ আন্দোলন এবং পরীক্ষায় আসার মতো সব ধরনের প্রশ্নোত্তর বিস্তারিতভাবে দেওয়া হয়েছে।

এই অধ্যায় থেকে পরীক্ষায় কত নম্বর আসে?
| প্রশ্নের ধরন | সংখ্যা (আনুমানিক) | নম্বর |
|---|---|---|
| MCQ | ৩-৪টি | ৩-৪ |
| SAQ (VSA) | ৩-৫টি | ৩-৫ |
| সংক্ষিপ্ত বিশ্লেষণ | ১-২টি | ৩-৬ |
| রচনাধর্মী | ০-১টি | ০-১০ |
| মোট | ৯-২৫ |
প্রথম অংশ — ঊনবিংশ শতকের বাংলা ও পত্রপত্রিকায় সমাজচিত্র
বাংলার নবজাগরণ (Bengal Renaissance)
ঊনবিংশ শতকে পাশ্চাত্য শিক্ষার প্রভাবে বাংলায় জ্ঞান, বিজ্ঞান ও যুক্তিবাদী চিন্তার যে জাগরণ ঘটে তাকে বাংলার নবজাগরণ বলা হয়। এই নবজাগরণে সমাজ সংস্কার, শিক্ষা সংস্কার ও ধর্মীয় সংস্কার একসাথে চলে।
তবে “নবজাগরণ” শব্দটি নিয়ে ইতিহাসবিদদের মধ্যে বিতর্ক আছে। কেউ কেউ বলেন এটা প্রকৃত নবজাগরণ ছিল না কারণ এটা সমাজের সীমিত অংশকে স্পর্শ করেছিল।
গুরুত্বপূর্ণ পত্রপত্রিকা
বামাবোধিনী পত্রিকা: ১৮৬৩ সালে প্রকাশিত এই পত্রিকা মূলত নারী শিক্ষা ও নারীর অধিকার নিয়ে সরব ছিল। নারীদের মধ্যে সচেতনতা তৈরিতে এই পত্রিকা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
হিন্দু প্যাট্রিয়ট: হরিশ মুখোপাধ্যায় পরিচালিত এই পত্রিকা নীলচাষীদের অত্যাচারের বিরুদ্ধে সরব ছিল এবং জাতীয়তাবাদী চেতনা প্রচার করত।
হুতোম প্যাঁচার নকশা: কালীপ্রসন্ন সিংহ রচিত এই গ্রন্থে ঊনবিংশ শতকের কলকাতার সমাজ ও সংস্কৃতির ব্যঙ্গাত্মক চিত্র তুলে ধরা হয়েছে।
নীলদর্পণ: দীনবন্ধু মিত্র রচিত এই নাটকে নীলকর সাহেবদের অত্যাচারের কথা বলা হয়েছে।
গ্রামবার্তা প্রকাশিকা: হরিনাথ মজুমদার (কাঙাল হরিনাথ) পরিচালিত এই পত্রিকা গ্রামের সাধারণ মানুষের জীবনের কথা তুলে ধরত।
দ্বিতীয় অংশ — শিক্ষা সংস্কার
প্রাচ্যবাদী ও পাশ্চাত্যবাদীদের বিতর্ক
ব্রিটিশ আমলে ভারতে কোন ধরনের শিক্ষা হবে তা নিয়ে দুটি মত ছিল। প্রাচ্যবাদীরা মনে করতেন সংস্কৃত ও আরবি শিক্ষার উপর জোর দেওয়া উচিত। পাশ্চাত্যবাদীরা মনে করতেন ইংরেজি ভাষায় পাশ্চাত্য বিজ্ঞান ও সংস্কৃতির শিক্ষা দেওয়া উচিত।
১৮৩৫ সালে লর্ড মেকলে তার বিখ্যাত “মিনিট”-এ পাশ্চাত্য শিক্ষার পক্ষে মত দেন এবং ইংরেজি শিক্ষা প্রবর্তন করা হয়।
রাজা রামমোহন রায় ও ইংরেজি শিক্ষার প্রসার
রাজা রামমোহন রায় আধুনিক ভারতের প্রথম সংস্কারক হিসেবে পরিচিত। তিনি পাশ্চাত্য শিক্ষার প্রসারের পক্ষপাতী ছিলেন এবং মনে করতেন বিজ্ঞান ও গণিত শিক্ষাই মানুষকে প্রকৃত জ্ঞানী করতে পারে।
রামমোহন রায়ের উদ্যোগে ১৮২৫ সালে কলকাতায় অ্যাংলো হিন্দু স্কুল প্রতিষ্ঠিত হয়। তিনি বেদান্ত কলেজ প্রতিষ্ঠা করেন যেখানে পাশ্চাত্য ও ভারতীয় শিক্ষার সমন্বয় ঘটানো হয়।
ডেভিড হেয়ার ও হিন্দু কলেজ
স্কটিশ ঘড়ি ব্যবসায়ী ডেভিড হেয়ার ভারতে শিক্ষার প্রসারে অসাধারণ ভূমিকা রেখেছেন। তিনি ১৮১৭ সালে হিন্দু কলেজ (বর্তমান প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয়) প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।
জন ইলিয়ট ড্রিংকওয়াটার বেথুন ও নারী শিক্ষা
জন ইলিয়ট ড্রিংকওয়াটার বেথুন ভারতে নারী শিক্ষার প্রসারে অগ্রণী ভূমিকা নেন। তিনি ১৮৪৯ সালে কলকাতায় বেথুন স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন যা ছিল ভারতের প্রথম বালিকা বিদ্যালয়গুলির একটি। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরও এই উদ্যোগে সক্রিয়ভাবে সহায়তা করেছিলেন।
কলকাতা মেডিক্যাল কলেজ ও বিজ্ঞানচর্চা
১৮৩৫ সালে কলকাতা মেডিক্যাল কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয়। এটি ভারতে আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞান শিক্ষার সূচনা করে। মধুসূদন গুপ্ত ছিলেন প্রথম ভারতীয় যিনি মানবদেহ ব্যবচ্ছেদ করেন।
ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর ও নারী শিক্ষার প্রসার
ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর বাংলার নারী শিক্ষার সবচেয়ে বড় পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। ১৮৫০-৫৮ সালের মধ্যে তিনি বাংলা ও বিহারে ৩৫টি বালিকা বিদ্যালয় স্থাপন করেন।

তৃতীয় অংশ — সমাজ সংস্কার
রামমোহন রায় ও সতীদাহ প্রথা রদ
সতীদাহ প্রথা ছিল ঊনবিংশ শতকের সবচেয়ে কুৎসিত সামাজিক প্রথাগুলির একটি। স্বামীর মৃত্যুর পর স্ত্রীকেও স্বামীর চিতায় জীবন্ত পুড়িয়ে মারা হতো।
রাজা রামমোহন রায় এই বর্বর প্রথার বিরুদ্ধে আজীবন লড়াই করেন। তিনি সমাজের মানুষকে বোঝানোর চেষ্টা করেন এবং সরকারের কাছে আবেদন করেন। তার অক্লান্ত প্রচেষ্টার ফলে ১৮২৯ সালে লর্ড উইলিয়াম বেন্টিংক সতীদাহ প্রথা আইনত নিষিদ্ধ করেন। এটি ছিল ভারতীয় সমাজ সংস্কারের ইতিহাসে একটি যুগান্তকারী ঘটনা।
বিদ্যাসাগর ও বিধবাবিবাহ আন্দোলন
ঊনবিংশ শতকে হিন্দু সমাজে বিধবা নারীদের অবস্থা ছিল অত্যন্ত করুণ। শিশু বয়সে বিধবা হওয়া মেয়েরা সমাজে চরম অবহেলা ও অত্যাচারের শিকার হতো।
ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর শাস্ত্রের প্রমাণ দিয়ে দেখান যে হিন্দু ধর্মে বিধবাবিবাহ নিষিদ্ধ নয়। তার আন্দোলনের ফলে ১৮৫৬ সালে লর্ড ডালহৌসির আমলে বিধবাবিবাহ আইন পাস হয়। এই আইন পাস হওয়ার পর বিদ্যাসাগর নিজে উদ্যোগ নিয়ে বেশ কিছু বিধবার বিবাহ দেন।
ইয়ং বেঙ্গল আন্দোলন ও ডিরোজিও
হেনরি লুই ভিভিয়ান ডিরোজিও ছিলেন হিন্দু কলেজের একজন তরুণ শিক্ষক। তিনি তার ছাত্রদের মধ্যে মুক্ত চিন্তা, যুক্তিবাদ ও প্রশ্ন করার মনোভাব তৈরি করেছিলেন।
ডিরোজিওর অনুগামীদের ইয়ং বেঙ্গল বলা হতো। তারা অন্ধ ধর্মীয় বিশ্বাস প্রত্যাখ্যান করতেন, নারীর অধিকারের কথা বলতেন এবং ব্রিটিশ সংস্কৃতির প্রতি আকৃষ্ট ছিলেন।
তবে ইয়ং বেঙ্গলের সমালোচনাও আছে। তারা মূলত শিক্ষিত উচ্চবর্গের আন্দোলন ছিল, সাধারণ মানুষের সাথে তাদের যোগাযোগ ছিল না।
চতুর্থ অংশ — ধর্মীয় সংস্কার
ব্রাহ্মসমাজ প্রতিষ্ঠা ও বিকাশ
রাজা রামমোহন রায় ১৮২৮ সালে ব্রাহ্মসমাজ প্রতিষ্ঠা করেন। এই সমাজ মূর্তিপূজা বর্জন করে একেশ্বরবাদ বা ঈশ্বরের ধারণায় বিশ্বাস করত।
পরে ব্রাহ্মসমাজ তিনটি ভাগে বিভক্ত হয় — আদি ব্রাহ্মসমাজ (দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রতিষ্ঠিত), ভারতবর্ষীয় ব্রাহ্মসমাজ (কেশবচন্দ্র সেন প্রতিষ্ঠিত) এবং সাধারণ ব্রাহ্মসমাজ।
ব্রাহ্মসমাজ নারী শিক্ষা, বিধবাবিবাহ ও সামাজিক সংস্কারের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
রামকৃষ্ণ পরমহংসের শিক্ষা
শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংস ছিলেন দক্ষিণেশ্বর মন্দিরের পুরোহিত। তিনি সর্বধর্মের সমন্বয়ের কথা বলতেন। তার বিখ্যাত বাণী ছিল “যত মত তত পথ”। তিনি বলতেন সব ধর্মেই ঈশ্বর আছেন, শুধু পথ আলাদা।
রামকৃষ্ণের জীবনদর্শন পরবর্তীকালে স্বামী বিবেকানন্দের দ্বারা বিশ্বে প্রচারিত হয়।
স্বামী বিবেকানন্দ ও রামকৃষ্ণ মিশন
স্বামী বিবেকানন্দ (মূল নাম নরেন্দ্রনাথ দত্ত) রামকৃষ্ণের প্রধান শিষ্য ছিলেন। তিনি ১৮৯৩ সালে শিকাগোতে বিশ্ব ধর্ম মহাসভায় হিন্দুধর্মের মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করেন।
তিনি ১৮৯৭ সালে রামকৃষ্ণ মিশন প্রতিষ্ঠা করেন। এই মিশন শিক্ষা, চিকিৎসা ও সমাজসেবার কাজ করে। বিবেকানন্দের “নব বেদান্ত” দর্শনে ধর্ম ও সমাজসেবার মেলবন্ধন ঘটানো হয়েছে।

পঞ্চম অংশ — বাংলার নবজাগরণ সম্পর্কে বিতর্ক
বাংলার নবজাগরণ নিয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ বিতর্ক আছে যা পরীক্ষায় রচনাধর্মী প্রশ্নে আসতে পারে।
পক্ষে মত: রামমোহন রায় থেকে বিবেকানন্দ পর্যন্ত বিশিষ্ট ব্যক্তিরা সমাজকে বদলানোর চেষ্টা করেছেন। সতীদাহ রদ, বিধবাবিবাহ আইন, নারী শিক্ষার প্রসার — এগুলো প্রকৃত অর্থে সামাজিক পরিবর্তন।
বিপক্ষে মত: এই আন্দোলন মূলত কলকাতার উচ্চ ও মধ্যবিত্ত হিন্দু সমাজের মধ্যে সীমিত ছিল। গ্রামের সাধারণ মানুষ, নিম্নবর্গ ও মুসলমান সমাজ এর সুফল পায়নি।
MCQ প্রশ্নোত্তর — ইতিহাস অধ্যায় ২
১. ব্রাহ্মসমাজ কে প্রতিষ্ঠা করেন?
ক) ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর
খ) রাজা রামমোহন রায় ✅
গ) স্বামী বিবেকানন্দ
ঘ) ডিরোজিও
ব্যাখ্যা: রাজা রামমোহন রায় ১৮২৮ সালে ব্রাহ্মসমাজ প্রতিষ্ঠা করেন।
২. সতীদাহ প্রথা কত সালে নিষিদ্ধ হয়?
ক) ১৮১৯
খ) ১৮২৫
গ) ১৮২৯ ✅
ঘ) ১৮৫৬
ব্যাখ্যা: ১৮২৯ সালে লর্ড উইলিয়াম বেন্টিংক সতীদাহ প্রথা আইনত নিষিদ্ধ করেন।
৩. বিধবাবিবাহ আইন কত সালে পাস হয়?
ক) ১৮২৯
খ) ১৮৪৯
গ) ১৮৫৬ ✅
ঘ) ১৮৬৩
ব্যাখ্যা: ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের প্রচেষ্টায় ১৮৫৬ সালে বিধবাবিবাহ আইন পাস হয়।
৪. “যত মত তত পথ” কার উক্তি?
ক) রামমোহন রায়
খ) বিদ্যাসাগর
গ) ডিরোজিও
ঘ) রামকৃষ্ণ পরমহংস ✅
ব্যাখ্যা: রামকৃষ্ণ পরমহংসের বিখ্যাত উক্তি “যত মত তত পথ” সর্বধর্মের সমন্বয়ের কথা বলে।
৫. হিন্দু কলেজ কত সালে প্রতিষ্ঠিত হয়?
ক) ১৮১৫
খ) ১৮১৭ ✅
গ) ১৮২০
ঘ) ১৮২৫
ব্যাখ্যা: ১৮১৭ সালে কলকাতায় হিন্দু কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয় যা বর্তমানে প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয় নামে পরিচিত।
SAQ প্রশ্নোত্তর
প্রশ্ন ১: রামমোহন রায়কে “আধুনিক ভারতের জনক” বলা হয় কেন?
উত্তর: রামমোহন রায় সতীদাহ প্রথার বিরুদ্ধে লড়াই করে তার আইনি নিষেধাজ্ঞা আনতে সাহায্য করেন। তিনি পাশ্চাত্য শিক্ষার প্রসারে কাজ করেন এবং ব্রাহ্মসমাজ প্রতিষ্ঠা করে ধর্মীয় সংস্কার আনেন। নারীর অধিকার, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা ও মানবাধিকারের পক্ষে তিনি সরব ছিলেন। এই বহুমাত্রিক কাজের জন্য তাকে আধুনিক ভারতের জনক বলা হয়।
প্রশ্ন ২: ডিরোজিও ও ইয়ং বেঙ্গলের অবদান কী?
উত্তর: ডিরোজিও হিন্দু কলেজের শিক্ষক হিসেবে তরুণ বাঙালিদের মধ্যে মুক্ত চিন্তা ও যুক্তিবাদের বীজ বপন করেন। তার অনুগামীরা (ইয়ং বেঙ্গল) ধর্মীয় গোঁড়ামির বিরুদ্ধে, নারীর অধিকারের পক্ষে এবং বৈজ্ঞানিক চেতনার পক্ষে সরব হন। তবে তারা মূলত উচ্চবর্গ ও শিক্ষিত শ্রেণির মধ্যে সীমিত ছিলেন।
প্রশ্ন ৩: স্বামী বিবেকানন্দের রামকৃষ্ণ মিশন প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্য কী ছিল?
উত্তর: স্বামী বিবেকানন্দ ১৮৯৭ সালে রামকৃষ্ণ মিশন প্রতিষ্ঠা করেন দেশের দরিদ্র ও অসহায় মানুষের সেবা করার উদ্দেশ্যে। তিনি বিশ্বাস করতেন মানব সেবাই ঈশ্বর সেবা। মিশন শিক্ষা, চিকিৎসা, দুর্যোগ ত্রাণ ও সমাজকল্যাণ কাজ করে। এই মিশন ধর্মকে ব্যক্তিগত মোক্ষের গণ্ডি ছেড়ে সমাজসেবার সাথে যুক্ত করে।
রচনাধর্মী প্রশ্ন
প্রশ্ন: ঊনবিংশ শতকে বাংলার সমাজ সংস্কারে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের ভূমিকা আলোচনা করো।
উত্তর:
ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর ছিলেন ঊনবিংশ শতকের বাংলার সবচেয়ে উজ্জ্বল সংস্কারক। পণ্ডিত, শিক্ষক এবং সমাজ সংস্কারক হিসেবে তিনি বাঙালি সমাজকে আমূল বদলে দেওয়ার স্বপ্ন দেখেছিলেন এবং সেই স্বপ্ন পূরণে আজীবন কাজ করেছেন।
বিধবাবিবাহ আন্দোলন: বিদ্যাসাগরের সবচেয়ে বড় অবদান হলো বিধবাবিবাহ আন্দোলন। হিন্দু সমাজে বিধবা নারীদের, বিশেষত শিশু বিধবাদের, অবস্থা ছিল অত্যন্ত কষ্টকর। বিদ্যাসাগর শাস্ত্রবচন থেকে প্রমাণ দিয়ে দেখান যে হিন্দু ধর্মে বিধবাবিবাহ নিষিদ্ধ নয়। তার অক্লান্ত প্রচেষ্টায় ১৮৫৬ সালে বিধবাবিবাহ আইন পাস হয়। শুধু আইন করেই তিনি থামেননি — নিজে উদ্যোগী হয়ে বেশ কিছু বিধবার বিবাহ দিয়েছিলেন।
নারী শিক্ষার প্রসার: বিদ্যাসাগর নারী শিক্ষার একজন নিরলস পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। ১৮৫০ থেকে ১৮৫৮ সালের মধ্যে তিনি বাংলা ও বিহারে ৩৫টি বালিকা বিদ্যালয় স্থাপন করেন। বেথুন সাহেবের সাথে মিলে নারী শিক্ষা প্রসারে কাজ করেন।
বাল্যবিবাহ ও বহুবিবাহের বিরুদ্ধে: বিদ্যাসাগর বাল্যবিবাহ ও কুলীন ব্রাহ্মণদের বহুবিবাহের তীব্র বিরোধী ছিলেন। তিনি এই প্রথাগুলো বন্ধ করার জন্য লেখালেখি ও আন্দোলন করেন।
শিক্ষা সংস্কার: বিদ্যাসাগর বাংলা গদ্যসাহিত্যের প্রকৃত জনক। তিনি “বোধোদয়”, “বর্ণপরিচয়” ইত্যাদি বই লিখে বাংলা শিক্ষার পদ্ধতি আধুনিক করেন। সংস্কৃত কলেজের অধ্যক্ষ হিসেবে তিনি উচ্চশিক্ষার আধুনিকীকরণে কাজ করেন।
বিদ্যাসাগরের সংস্কার কাজ শুধু আইন পাস করানোর মধ্যে সীমিত ছিল না — তিনি নিজে জীবন দিয়ে সেই আদর্শ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তার অটল ব্যক্তিত্ব ও নিরলস পরিশ্রম ঊনবিংশ শতকের বাংলার সমাজ সংস্কারকে একটি গভীর ভিত্তির উপর দাঁড় করিয়েছে।
গুরুত্বপূর্ণ তারিখ — পরীক্ষায় সাল মনে রাখা জরুরি
| সাল | ঘটনা |
|---|---|
| ১৮১৭ | হিন্দু কলেজ প্রতিষ্ঠা |
| ১৮২৮ | ব্রাহ্মসমাজ প্রতিষ্ঠা |
| ১৮২৯ | সতীদাহ প্রথা নিষিদ্ধ |
| ১৮৩৫ | কলকাতা মেডিক্যাল কলেজ প্রতিষ্ঠা, ইংরেজি শিক্ষা প্রবর্তন |
| ১৮৪৯ | বেথুন স্কুল প্রতিষ্ঠা |
| ১৮৫৬ | বিধবাবিবাহ আইন পাস |
| ১৮৬৩ | বামাবোধিনী পত্রিকা প্রকাশ |
| ১৮৯৩ | বিবেকানন্দের শিকাগো বক্তৃতা |
| ১৮৯৭ | রামকৃষ্ণ মিশন প্রতিষ্ঠা |
সচরাচর জিজ্ঞাসা (FAQ)
প্রশ্ন: ব্রাহ্মসমাজ কতটি ভাগে বিভক্ত হয়?
উত্তর: ব্রাহ্মসমাজ তিনটি ভাগে বিভক্ত হয় — আদি ব্রাহ্মসমাজ (দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর), ভারতবর্ষীয় ব্রাহ্মসমাজ (কেশবচন্দ্র সেন) এবং সাধারণ ব্রাহ্মসমাজ।
প্রশ্ন: নারী শিক্ষার প্রসারে কারা অবদান রেখেছেন?
উত্তর: নারী শিক্ষার প্রসারে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, জন ইলিয়ট ড্রিংকওয়াটার বেথুন ও রাজা রামমোহন রায় উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখেছেন।
প্রশ্ন: ডিরোজিওর ইয়ং বেঙ্গল আন্দোলনের সীমাবদ্ধতা কী ছিল?
উত্তর: ইয়ং বেঙ্গল আন্দোলন কলকাতার শিক্ষিত উচ্চ ও মধ্যবিত্তের মধ্যে সীমিত ছিল। গ্রামের সাধারণ মানুষ, নিম্নবর্গ ও মুসলমান সমাজের সাথে এর কোনো সংযোগ ছিল না।
আরও পড়ো: [মাধ্যমিক ইতিহাস অধ্যায় ১ নোট] | [মাধ্যমিক ইতিহাস অধ্যায় ৩ — প্রতিরোধ ও বিদ্রোহ] | [মাধ্যমিক ইতিহাস MCQ সম্পূর্ণ তালিকা]





