মাধ্যমিক ভৌতবিজ্ঞান তড়িৎ অধ্যায়ের সম্পূর্ণ নোট — ওহমের সূত্র, কির্চফের সূত্র, সিরিজ ও প্যারালাল, Joule-এর সূত্র, বৈদ্যুতিক মটর সব কিছু সহজ বাংলায়। WBBSE 2027।
- ভূমিকা
- তড়িৎ অধ্যায়ের নম্বর বিভাজন
- প্রথম অংশ — তড়িৎপ্রবাহের মূল ধারণা
- দ্বিতীয় অংশ — ওহমের সূত্র (Ohm’s Law)
- তৃতীয় অংশ — রোধের সংযোগ
- চতুর্থ অংশ — তড়িৎশক্তি ও ক্ষমতা
- পঞ্চম অংশ — তড়িৎের তাপীয় প্রভাব (Joule’s Law)
- ষষ্ঠ অংশ — তড়িৎচুম্বকীয় আবেশ
- Madhyamik Physical Science MCQ প্রশ্নোত্তর
- SAQ প্রশ্নোত্তর
- সচরাচর জিজ্ঞাসা (FAQ)
ভূমিকা
মাধ্যমিক ভৌতবিজ্ঞানের তড়িৎ অধ্যায় (Current Electricity) পরীক্ষার দিক থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রতি বছর এই অধ্যায় থেকে ১২-১৫ নম্বরের প্রশ্ন আসে। তড়িৎ অধ্যায়ে তত্ত্ব ও numerical — দুটোই সমান গুরুত্বপূর্ণ।
এই পোস্টে তড়িৎ অধ্যায়ের সমস্ত বিষয় — তড়িৎপ্রবাহ, বিভবপার্থক্য, ওহমের সূত্র, রোধের সংযোগ, তড়িৎশক্তি ও ক্ষমতা, তাপীয় প্রভাব এবং তড়িৎচুম্বকীয় আবেশ — সব কিছু সহজ বাংলায় উদাহরণ ও numerical সহ ব্যাখ্যা করা হয়েছে।

তড়িৎ অধ্যায়ের নম্বর বিভাজন
| বিষয় | প্রশ্নের ধরন | নম্বর (আনুমানিক) |
|---|---|---|
| ওহমের সূত্র ও numerical | MCQ ও SAQ | ৩-৫ |
| রোধের সংযোগ | SAQ ও রচনাধর্মী | ৩-৫ |
| তড়িৎশক্তি ও ক্ষমতা | SAQ ও numerical | ২-৪ |
| তাপীয় প্রভাব (Joule’s Law) | MCQ ও SAQ | ২-৩ |
| তড়িৎচুম্বকীয় আবেশ | MCQ ও SAQ | ২-৩ |
প্রথম অংশ — তড়িৎপ্রবাহের মূল ধারণা
তড়িৎপ্রবাহ (Electric Current) কী?
পরিবাহীর মধ্য দিয়ে ইলেকট্রনের প্রবাহকে তড়িৎপ্রবাহ বলে। ইলেকট্রন ঋণাত্মক প্রান্ত (উচ্চ বিভব) থেকে ধনাত্মক প্রান্তে (নিম্ন বিভব) প্রবাহিত হয়। কিন্তু প্রচলিত ধারণায় তড়িৎপ্রবাহের অভিমুখ ধনাত্মক প্রান্ত থেকে ঋণাত্মক প্রান্তে।
তড়িৎপ্রবাহের পরিমাপ:
I = Q/t
এখানে I = তড়িৎপ্রবাহ (অ্যাম্পিয়ার, A), Q = আধান (কুলম্ব, C), t = সময় (সেকেন্ড, s)।
১ অ্যাম্পিয়ার = ১ কুলম্ব/সেকেন্ড।
উদাহরণ: ২০ কুলম্ব আধান ৫ সেকেন্ডে প্রবাহিত হলে তড়িৎপ্রবাহ = ২০/৫ = ৪ অ্যাম্পিয়ার।
বিভব ও বিভবপার্থক্য (Potential and Potential Difference)
তড়িৎ বিভব: একটি বিন্দুতে একক ধনাত্মক আধানকে অসীম থেকে সেই বিন্দুতে আনতে যে কাজ করতে হয় তাকে সেই বিন্দুর তড়িৎ বিভব বলে। একক: ভোল্ট (V)।
বিভবপার্থক্য (Potential Difference): দুটি বিন্দুর বিভবের পার্থক্যকে বিভবপার্থক্য বলে। বিভবপার্থক্যের কারণেই তড়িৎপ্রবাহ হয়।
V = W/Q
এখানে V = বিভবপার্থক্য (ভোল্ট), W = কাজ (জুল), Q = আধান (কুলম্ব)।
তড়িৎচালক বল (EMF)
কোষ বা ব্যাটারি তড়িৎপ্রবাহ চালু রাখতে যে বল প্রয়োগ করে তাকে তড়িৎচালক বল বলে। একক: ভোল্ট।
দ্বিতীয় অংশ — ওহমের সূত্র (Ohm’s Law)
ওহমের সূত্র কী?
George Simon Ohm ১৮২৭ সালে এই সূত্র প্রতিষ্ঠা করেন।
সূত্র: নির্দিষ্ট তাপমাত্রায় কোনো পরিবাহীর মধ্য দিয়ে প্রবাহিত তড়িৎপ্রবাহ (I) পরিবাহীর দুই প্রান্তের বিভবপার্থক্যের (V) সমানুপাতিক।
V ∝ I অথবা V = IR
এখানে R = রোধ (Resistance), একক ওহম (Ω)।
ওহমের সূত্র থেকে: I = V/R এবং R = V/I
রোধ (Resistance) কী?
পরিবাহীতে তড়িৎপ্রবাহের বিরোধিতাকে রোধ বলে।
রোধের উপর নির্ভরশীল বিষয়:
রোধ তারের দৈর্ঘ্যের সমানুপাতিক (R ∝ L)
রোধ তারের প্রস্থচ্ছেদের ক্ষেত্রফলের ব্যস্তানুপাতিক (R ∝ 1/A)
রোধ পরিবাহীর উপাদানের উপর নির্ভর করে
রোধের সূত্র: R = ρL/A
এখানে ρ = আপেক্ষিক রোধ (Resistivity), L = দৈর্ঘ্য, A = প্রস্থচ্ছেদের ক্ষেত্রফল।
Numerical উদাহরণ
উদাহরণ ১: একটি পরিবাহীর রোধ ৫Ω। এর দুই প্রান্তের বিভবপার্থক্য ২০V হলে তড়িৎপ্রবাহ কত?
সমাধান: I = V/R = 20/5 = 4A।
উদাহরণ ২: একটি বর্তনীতে ৩A তড়িৎপ্রবাহ এবং ১৫Ω রোধ থাকলে বিভবপার্থক্য কত?
সমাধান: V = IR = 3 × 15 = 45V।
উদাহরণ ৩: একটি তারের দৈর্ঘ্য দ্বিগুণ করলে রোধের কী পরিবর্তন হবে?
সমাধান: R = ρL/A। দৈর্ঘ্য দ্বিগুণ হলে রোধও দ্বিগুণ হবে।

তৃতীয় অংশ — রোধের সংযোগ
সিরিজ সংযোগ (Series Connection)
সিরিজ সংযোগে রোধগুলো একটির পর একটি সংযুক্ত থাকে।
সিরিজে তুল্য রোধ:
R = R₁ + R₂ + R₃
বৈশিষ্ট্য:
তুল্য রোধ সর্বোচ্চ, প্রতিটি রোধে একই তড়িৎপ্রবাহ যায়, কিন্তু ভোল্টেজ বিভক্ত হয়। একটি বাল্ব নষ্ট হলে সার্কিট ভেঙে যায় — তখন বাকি সব বাল্ব নেভে।
Numerical উদাহরণ:
R₁ = 3Ω, R₂ = 5Ω, R₃ = 7Ω সিরিজে সংযুক্ত। তুল্য রোধ = 3 + 5 + 7 = 15Ω।
প্যারালাল সংযোগ (Parallel Connection)
প্যারালাল সংযোগে রোধগুলোর দুই প্রান্ত একই দুটি বিন্দুতে সংযুক্ত।
প্যারালালে তুল্য রোধ:
1/R = 1/R₁ + 1/R₂ + 1/R₃
বৈশিষ্ট্য:
তুল্য রোধ সর্বনিম্ন (যেকোনো একটি রোধের চেয়েও কম), প্রতিটি রোধে একই বিভবপার্থক্য কিন্তু তড়িৎপ্রবাহ বিভক্ত হয়। একটি বাল্ব নষ্ট হলেও বাকিগুলো জ্বলে — বাড়ির বর্তনী এই পদ্ধতিতে।
Numerical উদাহরণ:
R₁ = 6Ω ও R₂ = 3Ω প্যারালালে। তুল্য রোধ:
1/R = 1/6 + 1/3 = 1/6 + 2/6 = 3/6 = 1/2
∴ R = 2Ω।
সিরিজ ও প্যারালাল সংযোগের তুলনা
| বিষয় | সিরিজ | প্যারালাল |
|---|---|---|
| তুল্য রোধ | বেশি (R = R₁+R₂+…) | কম (1/R = 1/R₁+1/R₂+…) |
| তড়িৎপ্রবাহ | সবখানে সমান | শাখায় ভাগ হয় |
| ভোল্টেজ | ভাগ হয় | সবখানে সমান |
| ব্যবহার | Christmas light | বাড়ির সার্কিট |
চতুর্থ অংশ — তড়িৎশক্তি ও ক্ষমতা
তড়িৎশক্তি (Electrical Energy)
সূত্র: W = VIt = I²Rt = V²t/R
এখানে W = কাজ বা শক্তি (জুল), V = ভোল্টেজ, I = তড়িৎপ্রবাহ, R = রোধ, t = সময়।
তড়িৎ ক্ষমতা (Electrical Power)
সূত্র: P = W/t = VI = I²R = V²/R
একক: ওয়াট (W) বা কিলোওয়াট (kW)।
বাণিজ্যিক একক: কিলোওয়াট-ঘণ্টা (kWh) বা Unit।
1 kWh = 1000 W × 3600 s = 3.6 × 10⁶ J।
Numerical উদাহরণ:
উদাহরণ ১: ২২০V এ একটি বাল্বে ৫A তড়িৎপ্রবাহ হলে ক্ষমতা কত?
P = VI = 220 × 5 = 1100W = 1.1 kW।
উদাহরণ ২: একটি ৬০W বাল্ব প্রতিদিন ১০ ঘণ্টা জ্বলে। ৩০ দিনে কত unit বিদ্যুৎ খরচ হবে?
Energy = Power × Time = 60W × 10h × 30 = 18000 Wh = 18 kWh = 18 unit।
উদাহরণ ৩: প্রতি unit ৬ টাকা হলে উপরের বিলের মোট টাকা কত?
Bill = 18 unit × 6 = 108 টাকা।
পঞ্চম অংশ — তড়িৎের তাপীয় প্রভাব (Joule’s Law)
Joule-এর সূত্র
পরিবাহীতে তড়িৎপ্রবাহের ফলে যে তাপ উৎপন্ন হয়:
H = I²Rt
এখানে H = উৎপন্ন তাপ (জুল), I = তড়িৎপ্রবাহ (অ্যাম্পিয়ার), R = রোধ (ওহম), t = সময় (সেকেন্ড)।
তাপীয় প্রভাবের ব্যবহারিক প্রয়োগ
তড়িৎ বাল্ব, ইলেকট্রিক হিটার, ইলেকট্রিক ইস্তিরি, টোস্টার, ইলেকট্রিক ওভেন — এগুলো সব Joule-এর তাপীয় প্রভাবের উপর কাজ করে।
Fuse: বর্তনীতে অতিরিক্ত তড়িৎপ্রবাহ হলে Fuse গলে যায় এবং সার্কিট ভেঙে দেয়। Fuse তড়িৎ যন্ত্রপাতিকে রক্ষা করে।
Numerical উদাহরণ:
উদাহরণ ১: ৫Ω রোধে ৩A তড়িৎপ্রবাহ ২ মিনিট চললে উৎপন্ন তাপ কত?
H = I²Rt = 3² × 5 × (2 × 60) = 9 × 5 × 120 = 5400 জুল।

ষষ্ঠ অংশ — তড়িৎচুম্বকীয় আবেশ
চৌম্বক ক্ষেত্রে তড়িৎবাহী পরিবাহী
তড়িৎবাহী পরিবাহীর চারদিকে চৌম্বক ক্ষেত্র তৈরি হয়। এই নীতিকে Ampere-এর সূত্র বলে।
Fleming-এর বাম হাতের নিয়ম: বাম হাতের তর্জনী, মধ্যমা ও বৃদ্ধাঙ্গুলি পরস্পর লম্বভাবে রাখলে তর্জনী চৌম্বক ক্ষেত্রের দিক, মধ্যমা তড়িৎপ্রবাহের দিক এবং বৃদ্ধাঙ্গুলি পরিবাহীর গতির দিক দেখায়।
তড়িৎ মটর (Electric Motor)
তড়িৎ মটর তড়িৎ শক্তিকে যান্ত্রিক শক্তিতে রূপান্তরিত করে। চৌম্বক ক্ষেত্রে তড়িৎবাহী কুণ্ডলী ঘুরে — এই নীতিতে তড়িৎ মটর কাজ করে।
তড়িৎচুম্বকীয় আবেশ (Electromagnetic Induction)
চৌম্বক ক্ষেত্রের পরিবর্তনে পরিবাহীতে EMF উৎপন্ন হওয়াকে তড়িৎচুম্বকীয় আবেশ বলে। এই নীতি Faraday আবিষ্কার করেন।
Fleming-এর ডান হাতের নিয়ম: ডান হাতের তর্জনী, মধ্যমা ও বৃদ্ধাঙ্গুলি পরস্পর লম্বভাবে রাখলে তর্জনী চৌম্বক ক্ষেত্রের দিক, বৃদ্ধাঙ্গুলি পরিবাহীর গতির দিক এবং মধ্যমা আবিষ্ট তড়িৎপ্রবাহের দিক দেখায়।
তড়িৎ জেনারেটর (Electric Generator)
তড়িৎ জেনারেটর যান্ত্রিক শক্তিকে তড়িৎ শক্তিতে রূপান্তরিত করে। তড়িৎ মটরের বিপরীত প্রক্রিয়ায় কাজ করে।
AC ও DC-র পার্থক্য:
DC (Direct Current): তড়িৎপ্রবাহের অভিমুখ সবসময় একই থাকে। ব্যাটারি DC সরবরাহ করে।
AC (Alternating Current): তড়িৎপ্রবাহের অভিমুখ পরিবর্তন হয়। বাড়িতে সরবরাহকৃত বিদ্যুৎ AC।
Madhyamik Physical Science MCQ প্রশ্নোত্তর
১. ওহমের সূত্র থেকে সঠিক সম্পর্ক কোনটি?
ক) V = I/R
খ) V = IR ✅
গ) V = R/I
ঘ) I = VR
২. সিরিজ সংযোগে রোধের বৈশিষ্ট্য কোনটি?
ক) ভোল্টেজ সবজায়গায় সমান
খ) তড়িৎপ্রবাহ সবজায়গায় সমান ✅
গ) তুল্য রোধ সবচেয়ে কম
ঘ) এটি বাড়ির সার্কিটে ব্যবহার হয়
৩. Joule-এর সূত্র অনুযায়ী উৎপন্ন তাপ কিসের সমানুপাতিক?
ক) শুধু রোধের
খ) শুধু সময়ের
গ) I², R ও t-এর ✅
ঘ) শুধু তড়িৎপ্রবাহের
৪. তড়িৎ মটর কোন শক্তি রূপান্তর করে?
ক) যান্ত্রিক → তড়িৎ
খ) তড়িৎ → তাপ
গ) তড়িৎ → যান্ত্রিক ✅
ঘ) তাপ → তড়িৎ
৫. Fleming-এর কোন হাতের নিয়ম মটরে প্রযোজ্য?
ক) ডান হাত
খ) বাম হাত ✅
গ) উভয় হাত
ঘ) কোনোটিই নয়
SAQ প্রশ্নোত্তর
প্রশ্ন ১: সিরিজ ও প্যারালাল সংযোগের মধ্যে বাড়ির বর্তনীতে কোনটি ব্যবহার হয় এবং কেন?
উত্তর: বাড়ির বর্তনীতে প্যারালাল সংযোগ ব্যবহার হয়। কারণ প্যারালাল সংযোগে সব যন্ত্রপাতিতে একই ভোল্টেজ পাওয়া যায়। এছাড়া একটি যন্ত্র নষ্ট হলে বা বন্ধ করলে বাকিগুলো চলতে থাকে। সিরিজে হলে একটি বন্ধ হলে সব বন্ধ হয়ে যেত।
প্রশ্ন ২: তড়িৎ মটর ও তড়িৎ জেনারেটরের মধ্যে পার্থক্য কী?
উত্তর: তড়িৎ মটর তড়িৎ শক্তিকে যান্ত্রিক শক্তিতে রূপান্তরিত করে। ফ্যান, পাম্প, লিফট — এগুলো মটরের উদাহরণ। তড়িৎ জেনারেটর যান্ত্রিক শক্তিকে তড়িৎ শক্তিতে রূপান্তরিত করে। বিদ্যুৎকেন্দ্রে জেনারেটর ব্যবহার হয়। মটর ও জেনারেটর বিপরীত কাজ করে।
সচরাচর জিজ্ঞাসা (FAQ)
প্রশ্ন: তড়িৎপ্রবাহের SI একক কী?
উত্তর: তড়িৎপ্রবাহের SI একক অ্যাম্পিয়ার (A)।
প্রশ্ন: Fuse কীভাবে বর্তনীকে রক্ষা করে?
উত্তর: Fuse একটি কম গলনাঙ্কের তারের টুকরো যা বর্তনীতে সিরিজে সংযুক্ত থাকে। অতিরিক্ত তড়িৎপ্রবাহ হলে Fuse তাপে গলে যায় এবং সার্কিট ভেঙে যায়, ফলে যন্ত্রপাতি রক্ষা পায়।
আরও পড়ো: [মাধ্যমিক ভৌতবিজ্ঞান আলো অধ্যায় নোট] | [মাধ্যমিক ভৌতবিজ্ঞান তাপ অধ্যায় নোট] | [মাধ্যমিক ভৌতবিজ্ঞান MCQ]





